বাংলাদেশ ও নেদারল্যান্ডস
বাংলাদেশ ও নেদারল্যান্ডসের মধ্যে ভৌগোলিক, অর্থনৈতিক, ঐতিহাসিক ও কূটনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ মিল ও সম্পর্ক রয়েছে। উভয় দেশই নদীবাহিত ভূমির উপর নির্ভরশীল এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের সম্মুখীন। নেদারল্যান্ডস ইউরোপের নিম্নভূমির দেশগুলোর একটি, যেখানে প্রায় ২৬% জমি সমুদ্রপৃষ্ঠের নিচে অবস্থিত। অন্যদিকে, বাংলাদেশ বিশ্বের বৃহত্তম বদ্বীপ অঞ্চলের মধ্যে একটি, যেখানে গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা নদীর মিলিত প্রবাহ দেশের ভূপ্রকৃতিকে গঠিত করেছে। এই কারণেই উভয় দেশেই বন্যা, নদীভাঙন ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা করা একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ।
বাংলাদেশ ও নেদারল্যান্ডসের মিল ও সহযোগিতা:
১. পানি ব্যবস্থাপনা ও ডেল্টা পরিকল্পনা:
নেদারল্যান্ডস দীর্ঘদিন ধরে তাদের উন্নত পানি ব্যবস্থাপনার জন্য বিশ্বখ্যাত। দেশটি ডাইক (বাঁধ), পোল্ডার ও উন্নত নিষ্কাশন ব্যবস্থা ব্যবহার করে বন্যা প্রতিরোধ করে আসছে। বাংলাদেশও ডেল্টা অঞ্চলের দেশ হিসেবে নেদারল্যান্ডস থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে বাংলাদেশ ডেল্টা প্ল্যান ২১০০ প্রণয়ন করেছে। এই পরিকল্পনায় নেদারল্যান্ডস বিশেষজ্ঞ পরামর্শ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রদান করছে, যা বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি পানি ব্যবস্থাপনা ও জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় সাহায্য করছে।
২. কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তা:
নেদারল্যান্ডস বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম কৃষিপণ্য রপ্তানিকারক দেশ। উন্নত কৃষি প্রযুক্তি, সবুজ হাউজিং ও জলবায়ু সহনশীল চাষাবাদের কারণে দেশটি কৃষিক্ষেত্রে নেতৃত্ব দিচ্ছে। বাংলাদেশও কৃষিনির্ভর অর্থনীতি পরিচালনা করে এবং নেদারল্যান্ডস থেকে উন্নত কৃষি প্রযুক্তি, হাইড্রোপনিকস ও স্মার্ট ফার্মিংয়ের মতো আধুনিক পদ্ধতি শিখছে। বীজ উৎপাদন, দুগ্ধ শিল্প ও মৎস্য চাষেও নেদারল্যান্ডস বাংলাদেশের সঙ্গে কাজ করছে।
৩. অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক:
বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান রপ্তানি পণ্য হলো তৈরি পোশাক (RMG), যা নেদারল্যান্ডসের অন্যতম প্রধান আমদানি পণ্য। ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানির একটি উল্লেখযোগ্য অংশ নেদারল্যান্ডসের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। এছাড়া, দেশটি বাংলাদেশের চামড়া, সিরামিক, কৃষিপণ্য ও জাহাজ শিল্পের অন্যতম ক্রেতা। বাংলাদেশ-নেদারল্যান্ডস বিনিয়োগ চুক্তির মাধ্যমে পরিবেশবান্ধব ও টেকসই ব্যবসায়িক অংশীদারিত্ব গড়ে তুলছে।
৪. জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশ রক্ষা:
বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ দেশ, যেখানে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, লবণাক্ততা প্রবেশ ও ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাব দেখা যায়। নেদারল্যান্ডস জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামো ও পরিবেশবান্ধব উন্নয়ন প্রকল্পে বিনিয়োগ করছে। বাংলাদেশ-নেদারল্যান্ডস জলবায়ু অভিযোজন ও প্রশমন (Climate Adaptation & Mitigation) প্রকল্পের মাধ্যমে দুই দেশ একসঙ্গে কাজ করছে।
ঐতিহাসিক সম্পর্ক ও উল্লেখযোগ্য ঘটনা:
- ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের পর নেদারল্যান্ডস বাংলাদেশের স্বাধীনতা স্বীকৃতি দেয় এবং পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশকে উন্নয়ন সহায়তা দেওয়া শুরু করে।
- পদ্মা সেতু নির্মাণে নেদারল্যান্ডসের বিশেষজ্ঞরা নদী ব্যবস্থাপনায় সহায়তা প্রদান করে।
- রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় নেদারল্যান্ডস আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে একত্রে বাংলাদেশকে সহায়তা দিচ্ছে।
- ব্লু ইকোনমি ও মেরিটাইম সহযোগিতায় বাংলাদেশ ও নেদারল্যান্ডস বঙ্গোপসাগরের টেকসই সম্পদ ব্যবস্থাপনার জন্য কাজ করছে।
ভবিষ্যৎ সম্পর্কের দিকনির্দেশনা:
দুই দেশের সম্পর্ক সময়ের সঙ্গে আরও গভীর হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তন, কৃষি, অবকাঠামো উন্নয়ন, নীল অর্থনীতি ও প্রযুক্তি খাতে নেদারল্যান্ডস বাংলাদেশকে আরও দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ ও সহযোগিতা দেবে বলে আশা করা যায়। ফলে, নেদারল্যান্ডস বাংলাদেশের উন্নয়ন পরিকল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে টিকে থাকবে।