কেন্দ্রীয় ব্যাংক যে ভাবে অর্থের সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করে

 বাংলাদেশ ব্যাংক দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক হিসেবে অর্থের সরবরাহ নিয়ন্ত্রণের জন্য বিভিন্ন নীতি ও কৌশল গ্রহণ করে। এই নিয়ন্ত্রণের মূল উদ্দেশ্য হলো মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগে সহায়তা, এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা। নিচে বাংলাদেশ ব্যাংকের অর্থ সরবরাহ নিয়ন্ত্রণের প্রধান পদ্ধতিগুলো সংক্ষেপে ব্যাখ্যা করা হলো—

১. মুদ্রানীতি (Monetary Policy)

বাংলাদেশ ব্যাংক আগে বছরে দুইবার (জানুয়ারি ও জুলাই মাসে) মুদ্রানীতি ঘোষণা করতো।  বর্তমান বছরে একবার ঘোষণা করে। এটি মূলত দুটি ধরনের হতে পারে—
ক) সম্প্রসারণমূলক মুদ্রানীতি: অর্থনীতিতে বিনিয়োগ ও উৎপাদন বাড়াতে বাংলাদেশ ব্যাংক বাজারে বেশি টাকা সরবরাহ করে।
খ) সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি: মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করতে এবং অতিরিক্ত অর্থ সরবরাহ কমাতে কঠোর নীতি গ্রহণ করা হয়।

২. নগদ জমা অনুপাত (Cash Reserve Ratio - CRR) ও সীমান্তিক সংরক্ষণ অনুপাত (Statutory Liquidity Ratio - SLR)

CRR: বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে তাদের মোট আমানতের একটি নির্দিষ্ট অংশ বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে জমা রাখতে হয়। এই হার বাড়ালে বাজারে অর্থের সরবরাহ কমে যায় এবং কমালে সরবরাহ বাড়ে।
SLR: বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ সরকারি সিকিউরিটিজ ও অন্যান্য লিকুইড সম্পদে রাখতে হয়, যা অর্থ সরবরাহ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে।

৩. নীতি সুদের হার (Policy Interest Rate)

বাংলাদেশ ব্যাংক রিক্যাপ রেট (Repo Rate)রিভার্স রিক্যাপ রেট (Reverse Repo Rate) পরিবর্তন করে বাজারে অর্থের প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করে।

  • রিক্যাপ রেট বৃদ্ধি করলে ব্যাংকগুলোর জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়া ব্যয়বহুল হয়, ফলে বাজারে অর্থের সরবরাহ কমে যায়।
  • রিভার্স রিক্যাপ রেট বৃদ্ধি করলে ব্যাংকগুলো তাদের অতিরিক্ত টাকা বাংলাদেশ ব্যাংকে রেখে সুদ পেতে চায়, ফলে বাজারে অর্থ কম সরবরাহ হয়।


৪. খোলা বাজার কার্যক্রম (Open Market Operations - OMO)

বাংলাদেশ ব্যাংক সরকারি বন্ড ও ট্রেজারি বিল কেনাবেচার মাধ্যমে অর্থের সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করে।

  • বন্ড বিক্রি করলে বাজার থেকে অর্থ টেনে নেওয়া হয়, যা মুদ্রাস্ফীতি কমায়।
  • বন্ড কিনলে বাজারে টাকা প্রবাহ বাড়ে, যা বিনিয়োগ বাড়ায়।

৫. বৈদেশিক মুদ্রানীতি (Foreign Exchange Policy)

বাংলাদেশ ব্যাংক ডলারের বিনিময় হার নিয়ন্ত্রণ করে, যাতে টাকার মান স্থিতিশীল থাকে। অতিরিক্ত বৈদেশিক মুদ্রা বিক্রি বা ক্রয় করার মাধ্যমে বাজারে টাকার প্রবাহ নিয়ন্ত্রিত হয়।

৬. নৈতিক নির্দেশনা ও নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা

বাংলাদেশ ব্যাংক বিভিন্ন সময়ে ব্যাংকগুলোর ঋণ নীতির ওপর নির্দেশনা দেয়, যেমন—

  • খাতভিত্তিক ঋণ বরাদ্দ নিয়ন্ত্রণ
  • নির্দিষ্ট খাতে ঋণের সুদহার নির্ধারণ
  • অসাধু ঋণ কার্যক্রম রোধ করা

এইসব নীতির মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংক দেশের অর্থনীতিতে টাকার সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করে, যা মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগ উৎসাহিত করা ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সাহায্য করে।