একটি দেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থা কিভাবে পরিচালিত হয়

একটি দেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থা অর্থাৎ বিদ্যুৎ উৎপাদন,পরিবহন ও বিতরণ কিভাবে চলে সে বিষয়ে আলোচনা করা হলো।  একটি দেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থা তিনটি প্রধান স্তম্ভের উপর ভিত্তি করে চলে:

  1. বিদ্যুৎ উৎপাদন (Generation)
  2. ট্রান্সমিশন (Transmission)
  3. ডিস্ট্রিবিউশন (Distribution)

এই তিনটি স্তম্ভ কিভাবে সমন্বিতভাবে কাজ করে, তা নিচে বিস্তারিত ব্যাখ্যা করা হলো:


১. বিদ্যুৎ উৎপাদন (Power Generation)

বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য বিভিন্ন ধরণের উৎস ব্যবহৃত হয়, যেমন:

  • তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র (Thermal Power Plant) – কয়লা, গ্যাস, ডিজেল, কিংবা পারমাণবিক জ্বালানি ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়।
  • জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র (Hydropower Plant) – প্রবাহমান জল থেকে টারবাইন চালিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়।
  • নবায়নযোগ্য শক্তি (Renewable Energy Sources) – সৌরবিদ্যুৎ (Solar Power), বায়ু বিদ্যুৎ (Wind Power), বায়োগ্যাস এবং ভূ-তাপীয় শক্তি (Geothermal Energy) ব্যবহার করা হয়।

একটি দেশের বিদ্যুৎ চাহিদা অনুযায়ী এই উৎপাদন কেন্দ্রগুলো পরিকল্পিতভাবে পরিচালনা করা হয়।

mpintu



২. ট্রান্সমিশন (Power Transmission)

বিদ্যুৎ উৎপাদনের পর সেটি সরাসরি গ্রাহকের কাছে পাঠানো সম্ভব নয়, কারণ উচ্চ ভোল্টেজের বিদ্যুৎ সরাসরি ব্যবহার করা ঝুঁকিপূর্ণ এবং এতে বিদ্যুৎ ক্ষয় বেশি হয়। এজন্য ট্রান্সমিশন ব্যবস্থা প্রয়োজন।

কিভাবে ট্রান্সমিশন কাজ করে?

  • বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র থেকে উচ্চ ভোল্টেজে (১১ কেভি বা তার বেশি) বিদ্যুৎ ট্রান্সমিশন লাইন দিয়ে উপকেন্দ্রে (Substation) পাঠানো হয়।
  • ট্রান্সমিশন লাইন সাধারণত ১৩২ কেভি, ২৩০ কেভি বা ৪০০ কেভি হতে পারে, যাতে দীর্ঘ দূরত্বে বিদ্যুৎ পরিবহন করা যায়।
  • বিদ্যুৎ বিভিন্ন সাবস্টেশনে ট্রান্সফরমারের মাধ্যমে ধাপে ধাপে নিম্ন ভোল্টেজে নামানো হয়।

ট্রান্সমিশন লাইন দুই ধরনের হতে পারে:

  1. ওভারহেড (Overhead Transmission Line) – টাওয়ারের মাধ্যমে বিদ্যুৎ পরিবাহিত হয়।
  2. আন্ডারগ্রাউন্ড (Underground Transmission Line) – শহরাঞ্চলে মাটির নিচ দিয়ে তারের মাধ্যমে বিদ্যুৎ পরিবহন করা হয়।

৩. ডিস্ট্রিবিউশন (Power Distribution)

ট্রান্সমিশন লাইন থেকে বিদ্যুৎ সরাসরি গ্রাহকের কাছে যায় না, কারণ এটি তখনো উচ্চ ভোল্টেজে থাকে। তাই ডিস্ট্রিবিউশন সাবস্টেশনগুলোর মাধ্যমে এটি নিম্ন ভোল্টেজে রূপান্তরিত করে সরবরাহ করা হয়।

ডিস্ট্রিবিউশন প্রক্রিয়া:

  • ১৩২ কেভি বা ৩৩ কেভি সাবস্টেশন থেকে ১১ কেভি বা ৪০০ ভোল্টে নামানো হয়।
  • শিল্প প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, অফিসের জন্য ১১ কেভি সরবরাহ করা হয়।
  • আবাসিক গ্রাহকদের জন্য ২৩০-৪০০ ভোল্টের বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়।
  • শেষ পর্যায়ে ট্রান্সফরমার ও বিদ্যুৎ লাইনের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের ঘরে বিদ্যুৎ পৌঁছে।

ডিস্ট্রিবিউশন ব্যবস্থার প্রধান উপাদান:

  1. ডিস্ট্রিবিউশন সাবস্টেশন – এখানে ভোল্টেজ কমিয়ে গ্রাহকের উপযোগী করা হয়।
  2. ডিস্ট্রিবিউশন ট্রান্সফরমার – বিভিন্ন এলাকায় স্থাপিত ট্রান্সফরমার দ্বারা আরও নিম্ন ভোল্টেজে রূপান্তরিত করা হয়।
  3. স্মার্ট গ্রিড ও মিটারিং – স্মার্ট মিটার ও অটোমেশন প্রযুক্তি ব্যবহার করে বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনা আরও দক্ষ করা হয়।

বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনায় সমন্বয়

একটি দেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থা সমন্বিতভাবে পরিচালনার জন্য বিভিন্ন সংস্থা একসাথে কাজ করে। সাধারণত এই ব্যবস্থাপনা কয়েকটি ধাপে গঠিত হয়:

  1. বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী সংস্থা – যেমন, বাংলাদেশে PDB (Power Development Board) বা বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান।
  2. ট্রান্সমিশন অপারেটর – বিদ্যুৎ ট্রান্সমিশনের জন্য নির্দিষ্ট সংস্থা (যেমন, PGCB - Power Grid Company of Bangladesh)।
  3. ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি – বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুৎ বিতরণের জন্য নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠান থাকে (যেমন,পল্লী বিদ্যুৎ, DESCO, DPDC, NESCO)।

বিদ্যুৎ ব্যবস্থার চ্যালেঞ্জ ও সমাধান

  • লাইন ক্ষতি (Line Loss) – আধুনিক ট্রান্সফরমার ও তারের মাধ্যমে এটি কমানো যায়।
  • লোডশেডিং ও ঘাটতি – নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার ও বিদ্যুৎ সঞ্চয় করে রাখার (Battery Storage) ব্যবস্থা করতে হবে।
  • অনিয়ন্ত্রিত সংযোগ ও চুরি – স্মার্ট মিটার ও শক্তিশালী নজরদারির মাধ্যমে এটি রোধ করা যায়।

এই সমন্বিত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে একটি দেশ তার বিদ্যুৎ ব্যবস্থা কার্যকরভাবে পরিচালনা করতে পারে।